ঢাকার উত্তরা এলাকায় অবস্থিত মাইলস্টোন স্কুল ও কলেজে এক ভয়াবহ বিমান দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছে ২৭ জন, যার মধ্যে ২৫ জনই শিশু শিক্ষার্থী। আহত হয়েছেন আরও অন্তত ১৭১ জন, যাদের অনেকেই বর্তমানে রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় গোটা দেশ শোকাহত, আতঙ্কগ্রস্ত এবং ক্ষুব্ধ।
রাজধানী ঢাকার উত্তরা মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে ২১ জুলাই, ২০২৫ তারিখে বিমানবাহিনীর একটি প্রশিক্ষণ যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হয়ে এখন পর্যন্ত ২৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। নিহতদের মধ্যে ২৫ জনই শিশু শিক্ষার্থী, একজন শিক্ষক এবং একজন বিমানের পাইলট। এছাড়া ১৭১ জন আহত হয়েছে এবং ৭৮ জন রাজধানীর চারটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। আজ মঙ্গলবার (২২ জুলাই, ২০২৫) সকাল আটটার পর জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে আয়োজিত এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে এ তথ্য জানান প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী চিকিৎসক ডা. মো. সায়েদুর রহমান। জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের পরিচালক জানান, “অনেক শিশুর শরীরের ৩০-৬০% পর্যন্ত দগ্ধ হয়েছে। আমরা সাধ্যমতো চিকিৎসা দিচ্ছি, তবে কারও অবস্থা এখনও সংকটাপন্ন।” তিনি আরও জানান, ট্রমা ইউনিটে বিশেষজ্ঞ মনোবিদদের সংযুক্ত করা হয়েছে, কারণ অনেক শিশুই চরম মানসিক ভয়ের মধ্যে রয়েছে। এই দুর্ঘটনায় গোটা দেশ শোকাহত, আতঙ্কিত এবং ক্ষুব্ধ।
বিমান দুর্ঘটনার তথ্য (আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর-আইএসপিআর সূত্রে):
গতকাল (২১ জুলাই, ২০২৫) সোমবার দুপুর ১টা ৬ মিনিটে কুর্মিটোলা বিমানঘাঁটি থেকে উড্ডয়ন করে প্রশিক্ষণ যুদ্ধবিমানটি। কিছুক্ষণের মধ্যেই দুপুর ১টা ১৮ মিনিটে এটি মাইলস্টোন স্কুল চত্বরের একটি ভবনে বিধ্বস্ত হয়। চীনে তৈরি এফটি-৭ বিজিআই যুদ্ধবিমানটি প্রশিক্ষণের কাজে ব্যবহৃত হচ্ছিল এবং যান্ত্রিক ত্রুটির কারণেই দুর্ঘটনা ঘটে বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে।
ঘটনার সময়টি ছিলস্কুল ছুটির মূহুর্তে কিছু শিক্ষার্থী গেট দিয়ে বের হচ্ছিল, কেউ ক্লাসরুমে ছিল, আবার কেউ অপেক্ষমান ছিল অভিভাবকদের জন্য। হঠাৎই প্রশিক্ষণ বিমানটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে স্কুল চত্বরে বিধ্বস্ত হয় এবং সঙ্গে সঙ্গেই বিশাল বিস্ফোরণের মাধ্যমে আগুন ছড়িয়ে পড়ে। স্কুল ভবনের একাংশ, গেটসংলগ্ন এলাকা এবং পার্শ্ববর্তী খেলার মাঠ ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দুর্ঘটনার তীব্রতা এতটাই ছিল যে ঘটনাস্থলে থাকা অনেকেই ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারায়। দুর্ঘটনার সঙ্গে সঙ্গে ফায়ার সার্ভিস, র্যাব, সেনাবাহিনী ও স্থানীয় বাসিন্দারা উদ্ধারকাজে অংশ নেয়। আহতদের তাৎক্ষণিকভাবে উত্তরা, কুর্মিটোলা এবং বার্ন ইউনিটসহ রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতালে পাঠানো হয়।
প্রশাসনিক প্রতিক্রিয়া
বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বিমানটি একটি নিয়মিত প্রশিক্ষণ ফ্লাইটে ছিল, তবে এতে যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেয় এবং পাইলট জরুরি অবতরণের চেষ্টা করেন। প্রাথমিক তদন্তে ইঞ্জিন ব্যর্থতা ও সময়মতো যোগাযোগের অভাব উল্লেখ করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী, শিক্ষামন্ত্রী এবং বিমান প্রতিমন্ত্রী ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে সব ধরনের সহায়তার আশ্বাস দিয়েছেন। ইতোমধ্যে একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। বিমান বিধ্বস্তে হতাহতের ঘটনায় অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন। আজ ২২ জুলাই, ২০২৫ এক দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করেছে সরকার। বার্ন ইনস্টিটিউটে কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। পরিচয়পত্র ও রোগীর সম্পর্ক ছাড়া কাউকে প্রবেশ করতে দেওয়া হচ্ছে না। নিরাপত্তার দায়িত্বে রয়েছে সেনাবাহিনী।
সীমাবদ্ধতা ও অব্যবস্থাপনা:
- কতজন নিহত ও আহত তার সম্পূর্ণ ও নির্ভুল তালিকা নিয়ে আজ ২২ জুলাই পর্যন্ত বিভ্রান্তি রয়েছে।
- রাজধানী ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় প্রশিক্ষণ বিমান পরিচালনা দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্কিত।
- স্কুল, হাসপাতাল, আবাসিক এলাকা এবং জনসমাগমপূর্ণ স্থানের উপর দিয়ে যাত্রা করা যুদ্ধবিমান যেকোনো সময় ভয়াবহ দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে – এ বিষয়ে পর্যাপ্ত নীতিমালা বা প্রয়োগ ছিল না।
- বিমান বিধ্বস্তের ঘটনার অল্প মুহূর্তের মধ্যে মানুষের ঢল নামে যেন। উদ্ধার কার্যক্রমে যুক্ত মানুষের চেয়েও উৎসুক মানুষের ভিড় বেশি। উদ্ধারকাজ চলাকালে অনেকে ছবি ও ভিডিও তোলায় ব্যস্ত ছিলেন, যা কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটিয়েছে। হতাহতদের উদ্ধার থেকে শুরু করে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পথে চরম বিড়ম্বনার মুখে পড়তে হয়েছে উদ্ধারকারীদের। ঘটনাস্থল থেকেই বিষয়টি বারবার বলা হচ্ছিল। অতিরিক্ত মানুষের কারণে উদ্ধারকাজ ব্যাহত হচ্ছে। কিন্ত সময় যত গেছে, ততই যেন মানুষের ঢল বেড়েছে।
- ঢাকা মেডিকেল কলেজের জরুরি বিভাগ থেকে শুরু করে জাতীয় বার্ন ইনস্টিটিউট পর্যন্ত মানুষের ভিড় সামলানো কঠিন হয়ে পড়েছে। মানুষের ভিড়ের কারণে হাসপাতালে আসা–যাওয়ার পথ সংকুচিত হয়ে গেছে। অ্যাম্বুলেন্সের গতি কমে গেছে। এর মধ্যে রাজনৈতিক নেতারা দলবল নিয়ে হাসপাতালে ঢুকছেন। সরকারের কয়েকজন উপদেষ্টা ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিও হাসপাতালে ছুটে গিয়েছেন। রাজনৈতিক নেতা ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে অন্যান্য নেতা–কর্মী–সমর্থক, নিরাপত্তাকর্মী, মিডিয়াকর্মী মিলিয়ে রীতিমতো একটা হট্টগোল পরিস্থিতি তৈরি হলো হাসপাতাল এলাকায়। ভিড় সামলাতে কাজ করছে এমন স্বেচ্ছাসেবীদের এই কারণে বেগ পেতে হয়েছে অনেক।
- বহু স্বজন নিহত বা আহতদের অবস্থান জানাতে পারেননি। হাসপাতালগুলোতে একজন ‘information officer’ বা সহায়ক ডেস্ক তাৎক্ষণিকভাবে সক্রিয় ছিল না।
- স্কুলের শিক্ষার্থীদের আইড কার্ডে নাম ছাড়া অন্য কোন কার্যকরী তথ্য ছিল না, বিশেষ করে শিশুর পরিবার, বা অন্য কোন ইমার্জেন্সি ফোন নাম্বার বা অভিভাবকের নাম দেয়া নাই, ফলে নিহত ও আহতের পরিবারের নিকট তাদের সন্তানদের খবর পৌঁছে দিতে দেরি হয়েছে।
- এই ধরণের পরিস্থিতিতে সমন্বয়হীনতা দূর করার জন্য একক কমান্ডের অধীনে ইনসিডেন্ট কমান্ড সিস্টেমের আওতায় উদ্ধার র্কাযক্রমসহ অন্যান্য কার্যক্রম পরিচালনা করা উচিত, যা এই দুর্ঘটনায় করা হয়নি, ফলে বিপর্যয় আরো বেড়েছে।
- দুর্ঘটনা ঘটার সাথে সাথে স্কুল মাঠেই প্রশাসন প্রাথমিক চিকিৎসা প্রদানের ব্যবস্থা করা যেত কিন্তু তা করা হয়নি।
করণীয় – মানসিক পুনর্বাসন ও সহায়তা
- শিশুর মানসিক অবস্থা বোঝা ও মোকাবিলায় আমাদের সকলের সচেতন হতে হবে। প্রথমত শিশুদের কাছ থেকে কি হয়েছিল!, কেমনে হয়েছিল ! এমন বর্ণনা শোনা বন্ধ করতে হবে।
- পেশাদার মনোবিদদের সহায়তাআহত ও বেঁচে যাওয়া শিক্ষার্থীদের জন্য ট্রমা কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা করতে হবে।
- স্কুলে পুনর্বাসন কর্মসূচির মাধ্যমেক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষার্থীদের জন্য পর্যায়ক্রমে থেরাপি, সৃজনশীল কর্মকাণ্ড ও ধাপে ধাপে শ্রেণিকক্ষে ফেরা সহজ করতে হবে।
- এমন জাতীয় ট্রাজেডির পর, শিশু-কিশোরদের মানসিক স্বাস্থ্য পুনর্বাসনের জন্য জরুরি ভিত্তিতে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ দরকার।
সর্বোপরি, শুধু মাইলস্টোন স্কুলে অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থীর জন্য নয়, দেশের সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের আইডে কার্ডে প্রয়োজনীয় তথ্য, যেমন: অভিভাবকের নাম, ফোন নাম্বার এবং জরুরি যোগাযোগের তথ্য বাধ্যতামূলক করা হোক।
এই দুর্ঘটনা শুধু একটি দুর্ঘটনা নয় – এটি একটি জাতিগত ট্রাজেডি। একদিকে মূল্যবান প্রাণহানি, অন্যদিকে একটি প্রজন্মের মানসিক ভার। এখন জরুরি দায়িত্ব হচ্ছে, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়ানো, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিতে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া এবং ভবিষ্যতে এমন মর্মান্তিক ঘটনা রোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ।
ছবি: সংগৃহীত

