নতুন বছর উদযাপনে আতশবাজি ও ফানুস: প্রতিবছরই আগুন ও বিপদের শঙ্কা, প্রাণ হারায় নিরীহ পাখিরা

বছর শেষ হতে আর মাত্র কয়েকদিন বাকি। দেশে প্রতি বছরের মত এবছরও থার্টি ফার্স্ট নাইট বা ইংরেজি নববর্ষের উৎসব পালন করবে সকলে। থার্টি ফার্স্ট নাইট বা ইংরেজি নববর্ষের উৎসব বাংলাদেশে যেন প্রতিবছরই অগ্নি দুর্ঘটনার আগাম বার্তা নিয়ে আসে। ২০২৪ সালে পুলিশ নিষেধাজ্ঞা দিলেও তা উপেক্ষা করে ৩১ ডিসেম্বর রাতেও দেশের বিভিন্ন শহরে আতশবাজি ফোটানো ও ফানুস ওড়ানো হয়। রাত ১২টা বাজার আগেই ঢাকাসহ বড় শহরের আকাশ আলো ও শব্দে মুখরিত হয়ে ওঠে। একই সাথে এই অনিয়ন্ত্রিত উদযাপন বেশ কয়েকটি দুর্ঘটনার জন্ম দেয়। ঢাকায় ফানুস ও আতশবাজির আগুনে পাঁচজন দগ্ধ হন। তাছাড়া বৈদ্যুতিক তারে ফানুস পড়ে আগুন ধরে যাওয়ায় রাজধানীর কিছু এলাকায় সাময়িকভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। ২০২৩ সালেও একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, বেশ কিছু ফানুস পড়ে মেট্রো রেলের বৈদ্যুতিক তারে জড়িয়ে পড়ে। দুর্ঘটনা এড়াতে সেবাটি দুই ঘণ্টার জন্য বন্ধ রাখতে হয়।

এর আগে ২০২২ সালে ইংরেজি নববর্ষের রাতে (থার্টি ফার্স্ট নাইট) আতশবাজির শব্দে ভয় পেয়ে অসুস্থ হয়ে তানজিম উমায়ের নামে এক শিশুর মৃত্যুর ঘটনা ঘটে জন্ম থেকেই হৃদরোগে ভুগতে থাকা শিশুটি মাত্র চার মাস ১৯ দিন বয়সী ছিল উমায়েরের পরিবার রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা ২০২১ সালের ৩১ ডিসেম্বর রাতে বাজির শব্দে অসুস্থ হয়ে পড়লে পরদিন শনিবার (১ জানুয়ারি) শিশুটিকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায় সে। দেশের অন্যান্য জায়গায় এই ধরনের দুর্ঘটনা ঘটলেও সংবাদ মাধ্যমে আসে না।  

প্রতিবছর থার্টি ফার্স্ট নাইট নতুন বছর উদযাপনের সময়কার আতশবাজির ঝলকানি বিকট শব্দে আতঙ্কিত হয়ে পড়ে শহরের পাখিরা ভয়ে হাওয়ায় উড়ে গিয়ে বৈদ্যুতিক তার, জানালার কাচ কিংবা ভবনের গায়ে ধাক্কা খেয়ে মারা যায় অনেকে ফানুসের আগুনে ঝলসে গিয়েও অনেক পাখির মৃত্যু হয়

ফ্রন্টিয়ারস ইন ইকোলজি অ্যান্ড দ্য এনভায়রনমেন্ট জার্নালে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, সারা বিশ্বজুড়ে প্রতি নববর্ষে আতশবাজির কারণে আক্রান্ত হয় লাখ লাখ পাখি

বাংলাদেশ বার্ড ক্লাবের ২০২৩ সালের তথ্য অনুযায়ী, শুধু রাজধানী ঢাকাতেই বর্ষবরণের রাতে চারটি প্রজাতির শতাধিক পাখি মারা যায় এবং আরও অন্তত চার প্রজাতির পাখি ভয়ে আতঙ্কে তাদের বাসা ছেড়ে পালিয়ে যায় চড়ুই, টিয়া, লক্ষ্মীপ্যাঁচা, খঞ্জন শালিক এই প্রজাতিগুলো উল্লেখযোগ্য এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয় চড়ুই পাখির কাক, বাতাসী ঘরবাতাসী পাখির সংখ্যাও কম নয়

মানুষের তুলনায় পাখি অন্যান্য বন্যপ্রাণীর শ্রবণশক্তি অনেক বেশি উন্নত তাই আতশবাজির বিকট শব্দ আলোর ঝলকানিতে তারা চরমভাবে মস্তিস্কের চাপের মধ্যে পড়ে রাতে যখন তারা নিরাপদ আশ্রয়ে থাকে, তখন হঠাৎ বিকট শব্দে তাদের মনে প্রবল ভয়ের সৃষ্টি হয় ফলে তারা দিকভ্রান্ত হয়ে পড়ে, আকাশে ছুটে বেড়ায় এবং নানা স্থানে আঘাত পেয়ে মারা যায় উপরন্তু, আতশবাজির ধোঁয়া তাদের শ্বাসপ্রশ্বাসেরও মারাত্মক ক্ষতি করে সরকারের পক্ষ থেকে নানা ধরনের বিধি নিষেধ, নির্দেশনা দেয়া সত্ত্বেও প্রতিবছরই এই সময় আতশবাজি পটকা ফোটানোর শব্দে মারা যায় শতাধিক পাখি

শব্দদূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা, ২০০৬এর বিধি লঙ্ঘন করে অননুমোদিতভাবে থার্টি ফার্স্ট নাইট উদ্যাপনের সময় আতশবাজি পটকা ফোটালে তা বিধিমালার ১৮ বিধি অনুযায়ী দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে গণ্য এই আইন ভাঙলে প্রথম অপরাধের জন্য অনধিক মাস কারাদণ্ড বা অনধিক হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড এবং পরবর্তী অপরাধের জন্য অনধিক মাস কারাদণ্ড বা অনধিক ১০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড প্রদানের বিধান রয়েছে কিন্তু আইনের সঠিক প্রয়োগের অভাবে আলোচ্য বছরে এই উদযাপন চলেছে এবং অনেকগুলো দুর্ঘটনা সৃষ্টি হয়েছে

এই পুনরাবৃত্ত দুর্ঘটনাগুলো উদযাপনের নামে জননিরাপত্তা হুমকিতে পড়ার বিষয়টি বারবার সামনে নিয়ে এসেছে মানুষ, পরিবেশ প্রাণীদের কথা মাথায় রেখে আমাদের উদযাপন হতে হবে আরও সচেতন এবং সহানুভূতিশীল পরিবেশবান্ধব উদযাপন হবে মানুষ, পরিবেশ, পাখি অন্যান্য বন্যপ্রাণীর জীবনের প্রতি আমাদের দায়িত্ববোধের প্রকাশ জনসচেতনতা, কঠোর নিয়ন্ত্রণ আইন প্রয়োগের মাধ্যমে ধরনের দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব হবে উৎসবের আনন্দে কোনো প্রাণী যেন না হারায় তাদের জীবন নিরাপত্তা

ছবি: সংগৃহীত

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *