ভূমিকম্প ২০২৫: সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বড় ভূমিকম্প

গত ২১ নভেম্বর ২০২৫, শুক্রবার সকাল ১০টা ৩৮ মিনিট ২৬ সেকেন্ডে ঢাকার নিকটবর্তী নরসিংদীর মাধবদী উপজেলায় মাটির প্রায় ১০ কিলোমিটার গভীরে একটি শক্তিশালী ভূমিকম্প অনুভূত হয়। দেশি ও বিদেশি ভূতাত্ত্বিক সংস্থা এবং বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, ভূমিকম্পটির মাত্রা রিখটার স্কেলে ৫.৭ এবং মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (USGS) এটি ৫.৫ হিসেবে নির্ধারণ করেছে। ইউএসজিএসের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের প্রায় সাত কোটি মানুষ এই কম্পন অনুভব করেছেন। বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরও শুক্রবারের ভূমিকম্পটিকে স্মরণকালের মধ্যে অন্যতম ভয়াবহ ভূমিকম্প হিসেবে উল্লেখ করেছে।

এরপর ২২ নভেম্বর (শনিবার) সাড়ে সাত ঘণ্টার মধ্যে তিনবার ভূমিকম্প অনুভূত হয়। সকালে নরসিংদীর পলাশ উপজেলায় ৩.৩ মাত্রার একটি মৃদু কম্পন অনুভূত হয়। সন্ধ্যায় দুটি কম্পন পরপর নরসিংদী এবং রাজধানীর বাড্ডায় অনুভূত হয়, যথাক্রমে ৪.৩ এবং ৩.৭ মাত্রার। যদিও এই কম্পনগুলি মূল ভূমিকম্পের তুলনায় হালকা ছিল, তবুও জনসাধারণের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছিল।

গত ২১ নভেম্বর ভূমিকম্প ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় তীব্রভাবে অনুভূত হয়। পুরান ঢাকা, মুগদা, বংশাল এবং নারায়ণগঞ্জের অনেক পুরনো ও মধ্যম আকারের ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দেয়াল  এবং ছাদের রেলিং ধসে পড়েছে, যা পথচারী এবং স্থানীয়রা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ভূমিকম্পের ঝাঁকুনিতে কেউ সড়কে থাকা অবস্থায় আহত হয়েছে, কেউ জীবন বাঁচাতে লাফিয়ে পড়ে বা ছিটকে পড়ে আহত হয়েছেন।

ভূমিকম্পের ফলে কমপক্ষে ১১ জন প্রাণ হারিয়েছেন। নরসিংদী অঞ্চলে পাঁচজন, ঢাকার মুগদা এলাকায় একজন, বংশালে তিনজন এবং নারায়ণগঞ্জে দুইজন নিহত হয়েছেন। আহতের সংখ্যা প্রায় ৬০০, যার মধ্যে গাজীপুর কারখানার ২৫২ জন শ্রমিকও অন্তর্ভুক্ত। আহতদের মধ্যে কিছু রোগীর অবস্থা এখনো গুরুতর, তবে স্থিতিশীল রয়েছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট ডাক্তাররা।

হঠাৎ এই তীব্র কম্পনের কারণে মানুষ আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে, শিশুরা এবং বৃদ্ধ ও অসুস্থ ব্যক্তিরা মানসিকভাবে অসুস্থ বোধ করছেন। অনেক মানুষ নিরাপত্তার জন্য বাড়ির বাইরে বা খোলা জায়গায় চলে গেছে। অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি মারাত্মক না হলেও তা উল্লেখযোগ্য। অনেক পুরনো ভবনের দেয়ালে ফাটল দেখা দিয়েছে, কিছু ছাদের রেলিং ধসে পড়েছে, এবং কিছু রাস্তার সামান্য ফাটল সৃষ্টি হয়েছে। ভূমিকম্পের কারণে কিছু বিল্ডিং হেলে পড়েছে। প্রাথমিক প্রতিক্রিয়ায় স্থানীয় প্রশাসন, ফায়ার সার্ভিস এবং স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলো উদ্ধার, ত্রাণ ও চিকিৎসা কার্যক্রম পরিচালনা করছে। আহতদের হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে এবং জরুরি চিকিৎসা টিম মোতায়েন করা হয়েছে।

ভূমিকম্প-পরবর্তী পরিস্থিতির কারণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ১৫ দিন বন্ধ ঘোষণা করেছে। পরপর দুই দিনের ভূমিকম্পে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকেরা আতঙ্কিত হয়েছেন এবং কয়েকজন শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের সব অভ্যন্তরীণ ক্লাস ও পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে। এছাড়া ২২ নভেম্বর সন্ধ্যায় ভূমিকম্পের সময় ছাত্রী হলগুলোতে কয়েকজন শিক্ষার্থী আতঙ্কিত হয়ে সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় আহত হয়েছেন। শামসুন নাহার হলের তিনজন, বাংলাদেশ কুয়েত মৈত্রী হলের একজন এবং রোকেয়া হলের একজন আহত হয়েছেন।

ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণের জন্য নরসিংদী জেলার জেলা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটি বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শন করছে। সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন ভবনে ফাটল ধরা এবং হেলে পড়া ভবন চিহ্নিত করতে চার সদস্যবিশিষ্ট কমিটি গঠন করা হয়েছে। পৌর নির্বাহী প্রকৌশলীকে প্রধান করে গঠিত এই কমিটি এলাকা পরিদর্শন করে ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ করবে। পরবর্তী সময়ে জেলা পর্যায়ের কমিটি মোট ক্ষয়ক্ষতির পরিসংখ্যান নির্ধারণ করবে। জেলা প্রশাসন থেকে ২৩ নভেম্বর দুপুর ১২টায় জেলা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির মিটিং আহ্বান করা হয়েছে। ওই মিটিংয়ে জেলাজুড়ে সব ক্ষয়ক্ষতির পর্যালোচনা করা হবে এবং পরবর্তী করণীয় সম্পর্কে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে। জেলা প্রশাসক আরও জানিয়েছেন, ২১ নভেম্বরের ভূমিকম্পের তুলনায় ২২ নভেম্বরের দুটি ভূমিকম্পের মাত্রা কম ছিল। তবে উভয় কম্পনের উৎপত্তিস্থল নরসিংদী হওয়ায় সবাইকে আরও সতর্ক থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

ভূমিকম্পে নরসিংদী জেলার নিহত পাঁচজনের পরিবারকে জেলা প্রশাসন ২৫ হাজার টাকা করে প্রদান করেছে। ভূমিকম্পের কারণে মানুষ আতঙ্কিত হলেও বড় ধরনের ধ্বংস বা ব্যাপক ক্ষতি ঘটেনি। প্রশাসন উদ্ধার, ত্রাণ এবং পরিদর্শন কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে এবং জনগণকে সতর্ক থাকার জন্য নির্দেশ দিয়েছে।

এই দুর্যোগে রক্ষা পেতে যা করতে হবে;
• ভূমিকেম্পের আগাম প্রস্তুতি হিসেবে বাড়িতে একটি প্রাথমিক চিকিৎসা বাক্স ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র (টর্চ বা মোমবাতি, টাকা বা এটিম কার্ড) হাতের কাছে, সবার নজরে থাকে এমন জায়গায় রাখুন।
• ভূমিকম্পের স্থায়িত্ব কয়েক সেকেন্ড হতে সর্বোচ্চ মিনিট খানেক পর্যন্ত হতে পারে। এই সময়ে ঘরে অবস্থান করলে টেবিল বা ডেস্কের নিচে বিশেষ করে ঘরের বীম-এর অবস্থান নিন। আপনার মাথায় কোনোকিছুর আঘাত পাওয়া থেকে রক্ষা পাবেন।
• ভূমিকম্পের সময় আগুন লাগা থেকে রক্ষা পেতে যত দ্রুত সম্ভব রান্না ঘরের গ্যাস, তেল বা ইলেকট্রিক চুলা বন্ধ করুন।
• তাড়াহুড়ো করে বাইরে বের হবেন না, ভূমিকম্পের সময় তাড়াহুড়ো করে বাইরে বের হতে গেলে ভিড়ে চাপা পড়ে দুর্ঘটনা ঘটার আশংকা বৃদ্ধি পায়। এছাড়া ভূমিকম্পের আফটার শক কয়েকবার হয়, ফলে দুর্ঘটনার আশংকা বেশি থাকে।
• দালানে বসবাসকারীদের প্রধান সমস্যা হয় ভূমিকম্পের সময় দরজা আটকে বন্দি হয়ে যাওয়া। এইজন্য বাহির থেকে দরজা খোলার ব্যবস্থা রাখা উচিত।
• বাড়ির তাক, আলমারি ইত্যাদির উপর জিনিস রাখা উচিত নয়। ভূমিকম্পের সময় এগুলো পড়ে ঘরে থাকা মানুষজন আঘাতপ্রাপ্ত হতে পারে।
• বাইরে বের হবার সময় অনেকেই ওপর হতে কোনো কিছু পড়ে মাথায় আঘাত পেয়ে থাকেন। এটা এড়াতে মাথার ওপর শক্ত বোর্ড বা ট্রে জাতীয় কিছু ধরে রাখুন। এতে ওপর থেকে কিছু পড়লেও আপনার মাথায় আঘাত লাগবে না। বিছানায় শুয়ে থাকা অবস্থায় ভূমিকম্প হলে বালিশটি মাথার নীচ হতে মাথার ওপরে আনুন।
• সিনেমা হল, অডিটোরিয়াম, ডিপার্টমেন্ট স্টোর, রেলস্টেশন বা এয়ারপোর্টের মতো পাবলিক প্লেসে থাকলে সেখানে কর্তব্যরত নিরাপত্তা কর্মী ও স্বেচ্ছাসেবকদের পরামর্শ অনুসরণ করুন।
• ভূমিকম্পের সময় আপনি যদি গাড়ি চালানো অবস্থায় থাকেন তাহলে ধীরে ধীরে আপনার গাড়িটি রাস্তার বামপাশে পার্ক করুন। কোনো অবস্থাতেই ভূমিকম্পের সময় গাড়ি চালাবেন না।
• ভূমিকম্পের সময় আপনার গাড়িটি পাহাড়ী এলাকায় থাকলে ভূমিধ্বস এবং গড়িয়ে পড়া পাথরের আঘাত এড়াতে নিরাপদ স্থানে গাড়িটি পার্ক করুন।
• ভূমিকম্প এলাকা হতে নিরাপদ এলাকায় সরে যাবার জন্য গাড়ি ব্যবহার করার চেয়ে পায়ে হাঁটা অনেক নিরাপদ।

ধ্বংসস্তূপে আটকে পড়লে করণীয়
• ধূলাবালি থেকে বাঁচার জন্য আগেই সাথে রুমাল বা তোয়ালে বা চাদরের ব্যবস্থা করে রাখুন। ম্যাচ জ্বালাবেন না। দালান ধ্বসে পড়লে গ্যাস লিক হয়ে থাকতে পারে।
• চিৎকার করে ডাকাডাকি শেষ উপায় হিসেবে বিবেচনা করুন। কারণ, চিৎকারের সময় মুখে ক্ষতিকারক ধূলাবালি ঢুকে যেতে পারে। পাইপে বা ওয়ালে বাড়ি দিয়ে বা মুখে শিস বাজিয়ে দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করতে পারেন। তবে ভালো হয় সাথে যদি একটি রেফারির বাঁশি বা হুইসেল থাকে, তার প্রস্তুতি নিয়ে রাখুন আগেই।

ছবি : সংগৃহীত

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *