পরিস্থিতি প্রতিবেদন (আপডেট: ৯ জুলাই ২০২৬)
২০২৬ সালের জুলাই মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকে সক্রিয় মৌসুমি বায়ু এবং উত্তর বঙ্গোপসাগর ও তৎসংলগ্ন এলাকায় সৃষ্ট লঘুচাপের প্রভাবে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে টানা ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত রয়েছে। ৫ জুলাই থেকে শুরু হওয়া এ বৃষ্টিপাত দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল, উপকূলীয় এলাকা এবং পার্বত্য জেলাগুলোতে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে। অবিরাম বর্ষণ, পাহাড়ি ঢল এবং জোয়ারের পানির সম্মিলিত প্রভাবে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়িতে আকস্মিক বন্যা, জলাবদ্ধতা, পাহাড়ধস এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার ব্যাপক বিপর্যয় সৃষ্টি হয়েছে।
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ৯ জুলাই পর্যন্ত সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে দেশের বিভিন্ন স্থানে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত রয়েছে। বিশেষ করে দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে কয়েক দিনের টানা বর্ষণে নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়েছে, পাহাড়ের মাটি নরম হয়ে ভূমিধসের ঝুঁকি বেড়েছে এবং বিভিন্ন নিচু এলাকা প্লাবিত হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে জনজীবন, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, যোগাযোগ, পর্যটন, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং কৃষি কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। কক্সবাজারের রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরসহ বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় মানবিক সংকটের আশঙ্কাও বৃদ্ধি পেয়েছে।
ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা
বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত জেলা হলো—
- চট্টগ্রাম
- কক্সবাজার
- বান্দরবান
- রাঙ্গামাটি
- খাগড়াছড়ি
এছাড়াও ফেনী, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, কুমিল্লা, সিলেট, মৌলভীবাজার, ময়মনসিংহসহ দেশের আরও কয়েকটি জেলায় ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে স্থানীয়ভাবে জলাবদ্ধতা, নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি এবং নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। কিছু এলাকায় কৃষিজমি, মাছের ঘের, গ্রামীণ সড়ক এবং স্থানীয় অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
রেকর্ড ভাঙা বৃষ্টিপাত
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ৭ জুলাই ২০২৬ তারিখ বিকেল ৩টা পর্যন্ত পূর্ববর্তী ২৪ ঘণ্টায় চট্টগ্রামের পতেঙ্গা আবহাওয়া কেন্দ্রে ৪১২.৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে, যা গত প্রায় ৪৩ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। এর আগে ৪ আগস্ট ১৯৮৩ তারিখে একই কেন্দ্রে ২৪ ঘণ্টায় ৪১১ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছিল।
অন্যদিকে, কক্সবাজারে একদিনে প্রায় ২৬৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছে। বান্দরবান, রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়িতেও ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকায় পাহাড়ি ঢল, আকস্মিক বন্যা এবং ভূমিধসের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এই অস্বাভাবিক বর্ষণের ফলে চট্টগ্রাম মহানগরের অধিকাংশ নিচু এলাকা তলিয়ে যায়, বিভিন্ন সড়কে যান চলাচল ব্যাহত হয় এবং চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেল যোগাযোগ সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে পড়ে।
চট্টগ্রামের পরিস্থিতি
চট্টগ্রাম মহানগরী চলমান অতিবর্ষণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত নগরীগুলোর একটি। কয়েক দিনের টানা ভারী বর্ষণ এবং একই সময়ে জোয়ারের পানির প্রভাবে নগরীর অধিকাংশ নিচু এলাকায় ব্যাপক জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। অনেক এলাকায় হাঁটু থেকে কোমরসমান পানি জমে যায়। এতে জনজীবন প্রায় স্থবির হয়ে পড়ে এবং স্বাভাবিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়।
জলাবদ্ধতা
চকবাজার, আগ্রাবাদ, হালিশহর, কাতালগঞ্জ, বহদ্দারহাট, কাপাসগোলা, চান্দগাঁওসহ নগরীর অধিকাংশ নিচু এলাকায় দীর্ঘ সময় পানি জমে থাকে। অসংখ্য বাড়িঘর, দোকানপাট এবং ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের নিচতলা পানিতে তলিয়ে যায়। অনেক পরিবার ঘরবন্দি হয়ে পড়ে এবং জরুরি প্রয়োজন ছাড়া বাইরে বের হওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। বিভিন্ন স্থানে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যাহত হয় এবং নগরবাসীকে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়।
সড়ক যোগাযোগ
জলাবদ্ধতার কারণে নগরীর প্রধান সড়কগুলোতে যানবাহন চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। অনেক এলাকায় দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয় এবং কিছু এলাকায় যানবাহন চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে পড়ে। পানি জমে থাকায় গণপরিবহন, পণ্য পরিবহন এবং জরুরি সেবার যানবাহন চলাচলও বিঘ্নিত হয়। ফলে অফিসগামী মানুষ, শিক্ষার্থী এবং সাধারণ যাত্রীদের ব্যাপক দুর্ভোগে পড়তে হয়।
রেল যোগাযোগ
চলমান দুর্যোগে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেলপথ।
- ষোলোশহর থেকে জানালিহাট পর্যন্ত প্রায় ৪ কিলোমিটার রেললাইন প্রায় দুই ফুট পানির নিচে তলিয়ে যায়।
- পর্যটক এক্সপ্রেসসহ কয়েকটি ট্রেন মাঝপথে আটকা পড়ে।
- ৭ জুলাই থেকে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেলপথে ট্রেন চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ রাখা হয়।
- এ রুটে প্রতিদিন চার জোড়া ট্রেন চলাচল করে, যার দুটি ঢাকা এবং দুটি চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজারে যাতায়াত করে। ট্রেন চলাচল বন্ধ থাকায় শত শত যাত্রী ভোগান্তির শিকার হন এবং পর্যটন ও বাণিজ্যিক কার্যক্রমেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
বিমান চলাচলে বিঘ্ন
বৈরী আবহাওয়ার কারণে ৭ জুলাই চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত তিনটি ফ্লাইট অবতরণ করতে পারেনি। এর মধ্যে দুটি আন্তর্জাতিক এবং একটি অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট ছিল। বৈরী আবহাওয়া ও কম দৃশ্যমানতার কারণে বিমানগুলো নিরাপত্তার স্বার্থে ঢাকায় ফিরে যেতে বাধ্য হয়।
শিক্ষা কার্যক্রমে প্রভাব
দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে শিক্ষা কার্যক্রমও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে।
- এইচএসসি ও সমমানের নির্ধারিত কয়েকটি পাবলিক পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে।
- চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে সব ধরনের ক্লাস ও পরীক্ষা সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।
- বিভিন্ন স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।
- জলাবদ্ধতা ও যোগাযোগ সমস্যার কারণে অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্বাভাবিক কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারেনি।
কক্সবাজারের পরিস্থিতি
কক্সবাজার জেলা চলমান অতিবর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলের কারণে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত জেলার অন্যতম। জেলার উখিয়া, টেকনাফ, রামু, কুতুবদিয়া, চকরিয়া, পেকুয়া এবং কক্সবাজার সদর উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় টানা ভারী বৃষ্টিপাতের ফলে আকস্মিক বন্যা ও জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। নিচু এলাকার বসতবাড়ি, কৃষিজমি এবং স্থানীয় সড়ক পানির নিচে তলিয়ে যায়। অনেক এলাকায় যানবাহন চলাচল ব্যাহত হয় এবং শত শত পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়ে।
অবিরাম বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলের কারণে জেলার বিভিন্ন পাহাড়ি এলাকায় ভূমিধসের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। বিশেষ করে উখিয়া ও টেকনাফের রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরগুলোতে পাহাড়ধস, জলাবদ্ধতা এবং অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা দেখা দেয়। স্থানীয় প্রশাসন, শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (RRRC), জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা এবং মানবিক সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলো পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরে পরিস্থিতি
টানা ভারী বর্ষণের ফলে উখিয়া ও টেকনাফের রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরগুলোতে অন্তত ১৯৩টি ছোট ও বড় পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটেছে। ভূমিধস, মাটি ধসে যাওয়া এবং পাহাড়ি ঢলের কারণে আশ্রয়শিবিরের অভ্যন্তরীণ সড়ক, সিঁড়ি, ড্রেনেজ ব্যবস্থা, আশ্রয়কেন্দ্র এবং বিভিন্ন অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কায় প্রায় ২০ হাজার রোহিঙ্গা শরণার্থীকে অস্থায়ীভাবে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। ক্যাম্পজুড়ে স্বেচ্ছাসেবক দল, সাইট ম্যানেজমেন্ট কমিটি, ফায়ার সার্ভিস এবং মানবিক সংস্থাগুলো ঝুঁকিপূর্ণ স্থান চিহ্নিতকরণ, নিরাপদ আশ্রয়ে স্থানান্তর, প্রাথমিক চিকিৎসা, আশ্রয়সামগ্রী বিতরণ এবং জরুরি সেবা নিশ্চিত করার কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকায় রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরগুলোতে নতুন করে পাহাড়ধস এবং জলাবদ্ধতার ঝুঁকি এখনও বিদ্যমান রয়েছে।
বান্দরবানের পরিস্থিতি
টানা কয়েক দিনের অতিবর্ষণে বান্দরবান জেলার সার্বিক পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য অবনতি হয়েছে। অবিরাম বৃষ্টিপাতের কারণে জেলার বিভিন্ন পাহাড়ি এলাকায় ছোট-বড় পাহাড়ি ঝিরি ও ছড়াগুলোর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সঙ্গে সাঙ্গু, মাতামুহুরীসহ বিভিন্ন নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় নিম্নাঞ্চলে প্লাবনের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
অতিরিক্ত বৃষ্টিপাতের কারণে পাহাড়ের মাটি অত্যন্ত নরম হয়ে যাওয়ায় জেলার বিভিন্ন স্থানে ভূমিধসের ঝুঁকি বৃদ্ধি পেয়েছে। কয়েকটি এলাকায় পাহাড়ধসের ঘটনায় হতাহতের খবর পাওয়া গেছে এবং অনেক পরিবার নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যেতে বাধ্য হয়েছে।
পরিস্থিতি বিবেচনায় জেলা প্রশাসন পর্যটকদের নিরাপত্তার স্বার্থে জেলার বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্রে ভ্রমণ সাময়িকভাবে নিরুৎসাহিত বা সীমিত করেছে। পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারী পরিবারগুলোকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া, আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে সতর্কতামূলক প্রচারণা জোরদার করা হয়েছে।
রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়ির পরিস্থিতি
রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়ি জেলায়ও টানা ভারী বর্ষণ এবং পাহাড়ি ঢলের কারণে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হয়েছে। বিভিন্ন স্থানে পাহাড়ি ছড়ার পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় সড়ক প্লাবিত হয়েছে এবং কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সড়কে যান চলাচল ব্যাহত হয়েছে।
বিশেষ করে খাগড়াছড়ি-রাঙ্গামাটি সড়কের মাইছছড়ি এলাকায় সড়ক পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় যানবাহন চলাচলে বিঘ্ন ঘটে। বিভিন্ন ইউনিয়নের অভ্যন্তরীণ সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং কয়েকটি এলাকায় যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার উপক্রম হয়েছে।
অবিরাম বৃষ্টিপাতের ফলে পাহাড়ের মাটি নরম হয়ে যাওয়ায় নতুন করে ভূমিধসের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। জেলা প্রশাসন, ফায়ার সার্ভিস এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারী মানুষদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া এবং সচেতনতা বৃদ্ধির কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছেন।
এদিকে প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে রাঙ্গামাটির জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র সাজেক ভ্যালি সাময়িকভাবে পর্যটকদের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসন প্রয়োজনীয় সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে।
উদ্ধার ও প্রশাসনিক কার্যক্রম
ক্ষতিগ্রস্ত জেলাগুলোতে জেলা প্রশাসন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স, সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, পুলিশ, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, রেড ক্রিসেন্ট এবং বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী ও মানবিক সংস্থা সমন্বিতভাবে উদ্ধার ও সহায়তা কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারী পরিবারগুলোকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া, আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা, জরুরি খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানি বিতরণ, চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা এবং ক্ষয়ক্ষতির প্রাথমিক মূল্যায়নের কাজ চলমান রয়েছে। একই সঙ্গে স্থানীয় প্রশাসন নিয়মিত মাইকিং, গণসচেতনতামূলক প্রচারণা এবং আবহাওয়া অধিদপ্তরের সতর্কবার্তা প্রচার করছে, যাতে জনগণ সময়মতো নিরাপদ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে।
প্রাণহানি
চলমান অতিবর্ষণ, আকস্মিক বন্যা, পাহাড়ধস, দেয়ালধস এবং পানিতে ডুবে মৃত্যুর ঘটনায় দেশের বিভিন্ন জেলায় উল্লেখযোগ্য প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। ৯ জুলাই ২০২৬ পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, পাহাড়ধস ও দেয়ালধসে ২৮ জন এবং পানিতে ডুবে ১৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। অর্থাৎ এ পর্যন্ত মোট ৪৪ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। এছাড়া পাহাড়ধসের ঘটনায় কমপক্ষে ১৮ জন আহত হয়েছেন।
পাহাড়ধসজনিত প্রাণহানির অধিকাংশ ঘটনাই কক্সবাজার জেলার উখিয়া ও টেকনাফের রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবির, কক্সবাজার সদর, চকরিয়া, পেকুয়া, বান্দরবানের লামা, চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া ও পাঁচলাইশ এবং রাঙ্গামাটির বাঘাইছড়ি এলাকায় ঘটেছে। ভারী বর্ষণের কারণে পাহাড়ের মাটি নরম হয়ে যাওয়ায় অনেক বসতঘর ও পাহাড়ের ঢাল ধসে পড়ে হতাহতের ঘটনা ঘটে। কিছু এলাকায় দেয়ালধস এবং গাছচাপা পড়েও প্রাণহানির খবর পাওয়া গেছে।
অন্যদিকে, টানা বৃষ্টিপাত, বন্যা এবং জলাবদ্ধতার কারণে দেশের বিভিন্ন জেলায় নদী, পুকুর, খাল, বিল, হাওর ও জলাবদ্ধ এলাকায় পানিতে ডুবে ১৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। মৃতদের মধ্যে শিশুদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য, যা দুর্যোগকালীন শিশু নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তাকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।
পাহাড়ধসের ঝুঁকি
টানা কয়েক দিনের অতি ভারী বৃষ্টিপাতের ফলে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়ির পাহাড়ি এলাকাগুলোর মাটি অত্যন্ত নরম হয়ে গেছে। ফলে নতুন করে পাহাড়ধসের আশঙ্কা এখনও বিদ্যমান রয়েছে। বিশেষ করে পাহাড়ের পাদদেশে গড়ে ওঠা অনিরাপদ বসতি, ঝুঁকিপূর্ণ ঢালে নির্মিত ঘরবাড়ি এবং রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরগুলো সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
জেলা প্রশাসন, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং স্থানীয় প্রশাসন ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারী মানুষদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে। বিভিন্ন এলাকায় মাইকিং, গণসচেতনতামূলক প্রচারণা এবং স্বেচ্ছাসেবকদের মাধ্যমে আগাম সতর্কবার্তা প্রচার করা হচ্ছে। পাশাপাশি সম্ভাব্য ভূমিধস মোকাবিলায় আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা এবং জরুরি উদ্ধার সরঞ্জাম প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
সমুদ্রবন্দর ও মৎস্য খাত
সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে উত্তর বঙ্গোপসাগর উত্তাল থাকায় বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, মোংলা এবং পায়রা সমুদ্রবন্দরকে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত দেখিয়ে যেতে বলেছে।
একই সঙ্গে উত্তর বঙ্গোপসাগর এবং গভীর সমুদ্রে অবস্থানরত মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলারগুলোকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত নিরাপদ আশ্রয়ে থাকতে বলা হয়েছে। উপকূলীয় এলাকার জেলেদের অপ্রয়োজনীয়ভাবে গভীর সমুদ্রে না যাওয়ার জন্যও সতর্ক করা হয়েছে।
আবহাওয়ার পূর্বাভাস
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর ৯ জুলাই ২০২৬ তারিখে প্রকাশিত পাঁচ দিনের পূর্বাভাসে জানিয়েছে যে, ১০ জুলাই থেকে ১৪ জুলাই ২০২৬ পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন স্থানে বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে। এ সময় চট্টগ্রাম, সিলেট, বরিশাল, ঢাকা, ময়মনসিংহ এবং খুলনা বিভাগের অধিকাংশ স্থানে হালকা থেকে মাঝারি ধরনের বৃষ্টি অথবা বজ্রসহ বৃষ্টিপাতের পাশাপাশি কোথাও কোথাও মাঝারি ভারী থেকে অতি ভারী বর্ষণের সম্ভাবনা রয়েছে।
এ অবস্থায়—
- পার্বত্য জেলাগুলোতে নতুন করে পাহাড়ধসের ঝুঁকি সৃষ্টি হতে পারে;
- পাহাড়ি ঢলের কারণে আকস্মিক বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটতে পারে;
- নদ-নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পেয়ে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে;
- নগর এলাকায় দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হতে পারে;
- ঝুঁকিপূর্ণ অবকাঠামো এবং পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারী মানুষের জন্য ঝুঁকি আরও বৃদ্ধি পেতে পারে।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জনগণকে আবহাওয়া অধিদপ্তরের সর্বশেষ পূর্বাভাস অনুসরণ, অপ্রয়োজনীয় ভ্রমণ এড়িয়ে চলা এবং স্থানীয় প্রশাসনের নির্দেশনা মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছে।
উপসংহার
চলমান অতিবর্ষণ, আকস্মিক বন্যা এবং পাহাড়ধস দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে একটি জটিল মানবিক পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়ি জেলায় জনজীবন, যোগাযোগ ব্যবস্থা, শিক্ষা, কৃষি, পর্যটন, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং জীবিকার ওপর এর ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। একই সঙ্গে পাহাড়ধস, দেয়ালধস এবং পানিতে ডুবে মৃত্যুর ঘটনাগুলো পরিস্থিতির ভয়াবহতাকে আরও স্পষ্ট করেছে।
যদিও কিছু এলাকায় পানি ধীরে ধীরে কমতে শুরু করেছে, তবুও আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী আগামী কয়েকদিন ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে পাহাড়ধস, আকস্মিক বন্যা এবং জলাবদ্ধতার ঝুঁকি এখনও পুরোপুরি কাটেনি।
এ প্রেক্ষাপটে ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর জন্য জরুরি খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি, স্বাস্থ্যসেবা, নিরাপদ আশ্রয় এবং স্যানিটেশন সুবিধা নিশ্চিত করার পাশাপাশি দ্রুত ক্ষয়ক্ষতির মূল্যায়ন, ঝুঁকিপূর্ণ জনগণকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া এবং স্থানীয় প্রশাসন, সরকারি সংস্থা, মানবিক সহায়তা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান ও স্বেচ্ছাসেবকদের সমন্বিত কার্যক্রম আরও জোরদার করা প্রয়োজন। বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া উচিত পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারী মানুষ, রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবির, শিশু, নারী, বয়স্ক এবং অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপর।
ছবি: বাংলানিউজ২৪

