রাজধানীর কড়াইল বস্তিতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড: হাজারো পরিবার নিঃস্ব

গত ২৫ নভেম্বর (মঙ্গলবার) বিকেল ৫টা ২২ মিনিটে রাজধানীর মহাখালীর কড়াইল বস্তিতে এক ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত ঘটে। বস্তির বউবাজার এলাকার কুমিল্লা পট্টি, বরিশাল পট্টি ও ‘ক’ ব্লক—এই তিনটি অংশে দ্রুত আগুন ছড়িয়ে পড়ায় মুহূর্তেই ভয়াবহ রূপ নেয় পরিস্থিতি। আবাসস্থল হিসেবে ব্যবহৃত টিন-চটা কাঠামো, সংকীর্ণ গলি এবং তীব্র পানি সংকটের কারণে আগুন নির্বাপণে ব্যাপক বাধার মুখে পড়ে ফায়ার সার্ভিস।

ঘটনার পরপরই ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের ১৯টি ইউনিট একযোগে কাজ শুরু করে এবং টানা পাঁচ ঘণ্টার বেশি সময়ের চেষ্টার পর আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। তবে ততক্ষণে বিশাল এলাকা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। রাতেই ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশের প্রাথমিক তথ্যে জানা যায়—এই অগ্নিকাণ্ডে প্রায় ১ হাজার ৫০০ পরিবারের ঘরবাড়ি পুড়ে পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গেছে। এখন পর্যন্ত কোনো প্রাণহানির খবর পাওয়া না গেলেও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বিপুল এবং বহু পরিবার সম্পূর্ণরূপে নিঃস্ব হয়েছে। আগুন লাগার কারণ জানা যায়নি এখন পর্যন্ত। আগু‌নের কারণ ও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ জানতে ৫ সদস্যের ক‌মি‌টি গঠন করা হয়েছে।

নিঃস্ব মানুষের অসহায়তা: ভোরের আলোয় প্রকাশ পেল আগুনে পোড়া কড়াইল

২৫ নভেম্বর রাতের অগ্নিকাণ্ডের পর পরদিন ভোরে কড়াইল বস্তির চিত্র আরও নির্মমভাবে সামনে আসে। পোড়া টিন, কংক্রিট, ভস্মীভূত কাঠ, কালো ধোঁয়ার গন্ধ—সব মিলিয়ে সম্পূর্ণ লণ্ডভণ্ড একটি জনপদ। খোলা আকাশের নিচে হাজারো মানুষের আশ্রয়হীন অবস্থায় কাটাচ্ছে মানুষ।ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো নিজেদের যা কিছু অবশিষ্ট আছে, তা উদ্ধার করতে ফিরে এসেছে ধ্বংসস্তূপে। কারও হাতে অর্ধদগ্ধ কাপড়, কারও কাছে ভাঙা হাঁড়ি-পাতিল, কোথাও ছড়িয়ে রয়েছে পোড়া বই, স্কুলব্যাগ, আবার কোথাও গলে যাওয়া ইলেকট্রনিকস—মানুষের বহু বছরের সঞ্চয় ও স্মৃতি আগুনে হারিয়ে গেছে মুহূর্তে। এদের মধ্যে কেউ কেউ রেড ক্রিসেন্টের দেওয়া তাঁবুতে অস্থায়ীভাবে আশ্রয় নিয়েছেন, আবার অনেকেই খোলা জায়গায় গাদাগাদি করে শুয়ে আছেন। মানুষ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র বা সন্তানের বই খুঁজে পাওয়ার আশায় ছাইয়ের মধ্যে খুঁজে দেখছেন।

প্রধান উপদেষ্টার গভীর উদ্বেগ বার্তা

দুর্ভাগ্যজনক এই অগ্নিকাণ্ডে বিপুলসংখ্যক পরিবার নিঃস্ব হওয়ার ঘটনায় প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস গভীর শোক ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। ঘটনা ঘটার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই, ২৫ নভেম্বর রাতেই, তিনি এক বার্তায় আহতদের দ্রুত সুস্থতা কামনা করেন এবং আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর প্রতি আন্তরিক সহমর্মিতা জানান। তিনি জরুরি সহায়তা, পুনর্বাসন ও পুনর্গঠনের ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার আহ্বান জানান।

এই বছরে কড়াইল বস্তিতে দ্বিতীয় অগ্নিকাণ্ড

উল্লেখ্য, চলতি বছর এর আগেও রাজধানীর কড়াইল বস্তিতে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছিল। গত ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ রাতে প্রায় ১২টা ৪৪ মিনিটে রান্নাঘরের চুলা থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়। এতে বস্তির ৬১টি ঘর পুড়ে যায়। ফায়ার সার্ভিসের ১০টি ইউনিটের টানা চেষ্টায় রাত ১টা ৩৫ মিনিটে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। সৌভাগ্যবশত সে ঘটনায় হতাহতের কোনো ঘটনা ঘটেনি। ক্ষতিগ্রস্তদের আনুমানিক ১০ লাখ টাকার সম্পদ নষ্ট হয়েছে বলে ফায়ার সার্ভিস জানায়।

এই দুই ঘটনার মধ্যে তুলনা করলে স্পষ্ট হয়—অত্যন্ত ঘনবসতিপূর্ণ কড়াইল বস্তি অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকিতে রয়েছে বছরের পর বছর। গলির সংকীর্ণতা, পানি সরবরাহের সীমাবদ্ধতা, যত্রতত্র বিদ্যুতের তার রয়েছে, প্রত্যেক বাসায় গ্যাস সিলিন্ডার রয়েছে, এই সবই এ ধরনের বিপর্যয়কে আরও ভয়াবহ করে তোলে। আগুন লাগার উৎস বিভিন্ন হলেও ক্ষতির মাত্রা প্রায় একই রকম ধ্বংসাত্মক হয়ে উঠে।

গত ২৫ নভেম্বরের অগ্নিকাণ্ড কেবল একটি দুর্ঘটনা নয়— প্রতিবছরের মত এবারো এটি নগর দারিদ্র্য, অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং মৌলিক সুরক্ষা-ব্যবস্থার অভাবের নির্মম বাস্তবচিত্র তুলে ধরেছে। হাজারো সাধারণ মানুষের মাথা গোঁজার একমাত্র ঠাঁইটি আগুনে পুড়ে গেলে তাদের ভবিষ্যৎ অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। তাই এই ঘটনার পর জরুরি খাদ্য, পানি, চিকিৎসা ও আশ্রয় সহায়তার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে নিরাপদ আবাসন, অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং টেকসই পুনর্বাসন পরিকল্পনা এখন সময়ের দাবি।

অগ্নি প্রতিরোধে করণীয়;
• রান্নার পর চুলার আগুন নিভিয়ে রাখা;
• মশার কয়েল, বিড়ি বা সিগারেটের জ্বলন্ত অংশ নিভিয়ে নিরাপদ স্থানে ফেলা;
• ছোট ছেলেমেয়েদের আগুন নিয়ে খেলা থেকে বিরত রাখা;
• খোলা বাতির ব্যবহার বন্ধ রাখা;
• পরনের কাপড়ে আগুন লাগলে কখনো দৌঁডাবেন না, মাটিতে গাড়াগড়ি দিন।
• চুলার উপর ভেজা কাপড় বা লাকড়ি জাতীয় কিছু রাখা যাবে না।
• ত্রটিমুক্ত বৈদ্যুতিক তার ও সরঞ্জাম ব্যবহার না করা।
• হাতের কাছে সব সময় দুই বালতি পানি ও বালু রাখা।
• ঘরবাড়ি, অফিস আদালত ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান সার্বক্ষনিক পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখা ও পর্যাপ্ত পানি রাখা।
• বাসগৃহ, কলকারখানা ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে অগ্নি নির্বাপনী যন্ত্রপাতি স্থাপন করা এবং মাঝে মাঝে তা পরীক্ষা করা।
• বস্তি, কলকারখানার নিকট পর্যাপ্ত পানির ব্যবস্থা রাখা।
• গুদাম বা কারখানায় ধুমপান নিষিদ্ধ করা ও সতর্কীকরন পোষ্টার লাগানো।
• স্থানীয় ফায়ার ষ্টেশনের ফোন নাম্বার সংরক্ষণে রাখা।
• সর্বোপরি লাগুন লাগলে ঘাবড়ে না গিয়ে মাথা ঠাণ্ডা রেখে করণীয় ঠিক করুন।

ধোঁয়ার মধ্যে হতে কিভাবে নিরাপদে বের হবেন ?
অগ্নিদূর্ঘটনায় যে সকল প্রাণহাণীর ঘটনা ঘটে থাকে তার জন্য আগুনজনিত ধোঁয়াই দায়ী। কখনও যদি নিরাপদ স্থানে গমনের জন্য ধোঁয়ার মধ্য দিয়ে অতিক্রম করতে হয় সেক্ষেত্রে কিছু পন্থা অবলম্বন দরকার। মনে রাখতে হবে ধোঁয়া বাতাস অপেক্ষা হালকা তাই উর্দ্ধমূখী। এজন্য যে ফ্লোরে আগুন তার নিচের ফ্লোরে বা খোলা জায়গায় চলে আসতে হবে। ধোঁয়াময় স্থান দৌড়ে অতিক্রম করা যাবে না। হামাগুঁড়ি দিয়ে বের হয়ে আসতে হবে কেননা ফ্লোর হতে ৩০ থেকে ৬০ সে. মি. পর্যন্ত বিশুদ্ধ বাতাস থাকে।

আগুনে পুড়ে গেলে করণীয়
• আক্রান্ত ব্যক্তিকে এমনভাবে শুইয়ে দিতে হবে যেন পুড়ে যাওয়া অংশ খোলা দিকে থাকে। তারপর জগ বা মগে করে পোড়া জায়গায় ঠাণ্ডা পানি বা বরফ পানি ঢালতে হবে যতক্ষণ না পর্যন্ত জ্বালা যন্ত্রণা কমে এবং ক্ষত স্থানের গরম ভাবও কমে না যায়।
• আক্রান্ত স্থানটি ফুলে যাওয়ার আগে সেখান থেকে ঘড়ি, বেল্ট, আংটি (যদি থাকে), কাপড় খুলে ফেলতে হবে।
• পুড়ে যাওয়ার অংশে কাপড় লেগে থাকলে তবে সেটা না টেনে বাকি কাপড় কেটে সরিয়ে ফেলতে হবে।
• পরিষ্কার জীবাণুমুক্ত ব্যন্ডেজ বা কাপড় দিয়ে ক্ষতস্থান হালকা করে বেঁধে দিতে হবে।
• যদি মুখে কোথাও পুড়ে যায় তবে পানি দিয়ে ঠান্ডা করতে হবে যতক্ষণ না ক্ষত স্থান ঠান্ডা হয় এবং ব্যাথা কমে। মুখ ঢাকবার প্রয়োজন নেই, তবে পরিষ্কার জীবাণুমুক্ত কাপড় দিয়ে এমনভাবে মাস্ক তৈরি করতে হবে যাতে নাক, মুখ ও চোখ করে মুখ ঢাকা যায়।
• পোড়া জায়গা দিয়ে শরীরের প্রয়োজনীয় জলীয় পদার্থ বের হয়ে যায়, যার ফলে আক্রান্ত ব্যাক্তি শকে চলে যেতে পারে। অর্র্থাৎ রক্তচাপ কমে যায়, হৃদপিন্ডের স্পন্দন কমে যায় এবয় স্বাস-প্রশ্বাস ব্যাহত হয়। এই অবস্থায় তাড়াতাড়ি চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহন করা উচিত।

ছবি: বাংলা ট্রিবিউন

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *